১.
চোখটা আটকে আছে দরজার দিকে।
বিছানায় মুখ বাঁধা, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আমি পড়ে আছি। অপলক, অনুভূতিহীন চোখে তাকিয়েই আছি। এক একটি সেকেন্ড যাচ্ছে যেন শম্বুক গতিতে। আর কত সময় থাকবো আমি এভাবে পড়ে? আর কতক্ষন পর আমার দেহে আক্রমন হবে সেই হিংস্র পশুর দ্বারা? এই আমার কি আজই পৃথিবীর শেষ রাত? আজই কি আমার আভা নামটি মুছে যাবে চিরতরে? আমাকে কি বেঁচে রাখবে? নাকি ফেলে রাখা হবে কোনো আবর্জনাতে ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায়? এই জগতটাই যে আবর্জনার স্তুপ, বড় নোংরা কলুষিতময় এই জগত। আর যদি বেঁচে থাকি, তখন? নাহ, আমাকে বাঁচিয়ে রাখলেও আমি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবো না। এই জগতের প্রতি আমার নির্মম প্রতিশোধ হবে নিজেকে হন্তা করে। এই হবে আমার পরিণতি।
কিন্তু আমি কি এমন চেয়েছিলাম?
আমি তো এই সতের বছরের জীবনে সব সময় শুনে এসেছিলাম, জগত অনেক নির্মম, অনেক কঠিন। হেসে-খেলে যে যাচ্ছিল সময়। কত আদর ভালবাসায়! কত স্বপ্ন ছিল, কত সুন্দর ভবিষ্যতের আল্পনা ছিল কল্পনার দেয়ালে। জেলা গার্লস স্কুল হতে এ+ পেলাম। এখনও মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা, স্কুলের সংবর্ধনার কথা। নিজের শেষ দিনটিতে বোধহয় আজ সব চোখে ভেসে যাবে। আমার মা’কে খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে, বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে।
মা….মাগো, আমাকে বাঁচাও, আমি যে নরকের দরজায় এখন মা। একটু পর এক হায়েনা যে আমায় নরকের আগুনে পোড়াবে মা…………..
২.
গাড়ি শো শো করে চলেছে।
সামনে দু’টো, পেছনে দু’টো, আর মাঝে আমার গাড়ি। রাত একটার মতো বাজে, তবু কেমন যেন মনে হচ্ছে সারা পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে। গাড়ির সাথে বাতাসের ঘর্ষনের শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ পাওয়া যাচ্ছেনা। ড্রাইভার কঠোর নজরে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে, আর তার পাশে আমার পিএ এবং সকল কর্মের ডান হাত কবির বসে রয়েছে নির্লিপ্তভাবে। একে একে হয়তো ছক সাজাচ্ছে, কিভাবে কি হলে সব সুরাহা হবে। আর আমি? কালো জানালার ভেতর হতে রাস্তার পাশের অন্ধকার দেখে চলেছি। শহর হতে আসা দু’ঘন্টার পথ প্রায় শেষ, আর একটু পরই পৌঁছাবো এক বাগানবাড়িতে। বের হয়েছিলাম নিজের ক্ষমতার প্রদর্শনের জন্য, অনেক কিছু নিজের আয়ত্ত্বে আনবার জন্য। কিন্তু বিধাতার পরিকল্পনা ছিল যে অন্য কিছু। হঠাৎ কবিরের ফোন বেজে উঠতেই সে আমার দিকে ফিরে মোবাইলটা এগিয়ে দিলো। কানে ধরতেই এক কুৎসিত হাসির সাথে শুনলাম,
– কিরে আমার ছোট খোকা, কই তুই? আর কতক্ষণ?
– আর বেশিক্ষণ লাগবেনা, পাঁচ কি সাত মিনিট?
– জলদি আয়, আমার নেশা উঠে গেছে চরমভাবে, হে হে হে, আর অন্য নেশাও যে চেপে রাখতে পারছিনা।
– আমি আসছি ভাইয়া, তুমি মদ বেশি পান করোনা। আমি আসছি।
– আয় আয়,আমি তো তোর অপেক্ষাতেই আছিরে মিজহাব। বলেই লাইন কেটে যায়।
অপেক্ষা।
এমন দিনের জন্য ছিল আমারও অপেক্ষা। যখন হারানো ক্ষমতা এবং সবকিছু উদ্ধার করি, তখন থেকেই পণ, নিজের এই ফুপাতো ভাইকে হটিয়ে অদৃশ্য সাম্রাজ্যে নিজেকে আরও উঁচুতে বসাবো। সব দখল করে নেবো, সব। আজ ছিল তেমনই একটি দিন। কিন্তু পৃথিবী থেকে সরিয়ে নয়, পৃথিবীতে তাকে রেখেই দেখাতে চেয়েছিলাম আমার ক্ষমতা। ক্ষমতার এই খেলাতে সে পুরনো খেলোয়ার এবং ভয়ংকর। আমি নতুন নই, অনেক বিচক্ষণ এবং আরও ভয়ংকর। হয়ে যাবে আজ প্রমাণ, কে কত ভয়ংকর! তার কোনো সুযোগই নেই, সব দিক থেকে জাল বিছানো ছিল। কিন্তু শেষ মূহৃর্তেই জানলাম অন্যকিছু, খুব জঘন্য আর ভয়ংকর কিছু!
৩.
খুব পানির তৃষ্ণা পেয়েছে আমার।
গলা শুকিয়ে কাঠ। চোখের পানি আর আসছেনা, সব যেন মরুর গ্রাসে বিলীন। শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। বিধাতাকে আর যে ডাকতে পারছিনা, বিধাতা কি সব দেখেও অন্ধ? মনপ্রাণ দিয়ে যে ডাকলে সবই দেন বিধাতা, একি তাহলে শুধুই ধর্মগ্রন্থের মেকি লাইন? বিধাতা, ও বিধাতা………………
৪.
প্রধান সড়ক হতে নেমে বেশ ভেতরে গাড়িগুলো থামলো।
কয়েক মিনিটের হাঁটাপথ শুধু। দূর হতেই দেখা যাচ্ছে দোতলা সেই বাড়িটা। সবাইকে অপেক্ষা করতে বলে আমি, আমার পিএ সমেত আরও দু’জন এগিয়ে চললাম দ্রুততায়। এক একটি মূহুর্ত এখন আমার অনেক মূল্যবান। বাড়ির দরজা খুলতেই সুদৃশ্য ড্রইংরুমে একা বসে থাকতে দেখা গেলো আমার ফুপাতো ভাই হায়াতকে। সে একাই বসে ছিল, অবশ্য তার এসব সময় বাড়ির ভেতর কেউ থাকেনা। যারা বাইরে ছিল তাদের ব্যবস্থা নিঃশব্দে হয়েছে কিছু আগেই। এখন সে মদে চুর পুরোই, তবে হুঁশ আছে ভাল।
– ওয়েলকাম ওয়েলকাম আমার ছোট্ট ভাই, আয় কাছে আয়। কতদিন তোরে জড়িয়ে ধরিনা, বলেই কুৎসিত একটা হাসি দিয়ে কাছে এলো হায়াত।
– আমার সময় কম ভাইয়া।
– আরে রাখ, কিসের সময়, কিসের এত তাড়া? আজ রাত হবে তোর আমার মৌজমাস্তির, হে হে হে, দাঁড়া, গ্লাস দেই তোরে।
– না ভাইয়া, তোমার সাথে কথা আছে। তুমি আগে বোস।
– আরে বল, দাঁড়িয়েই বল। আমার আজ বেশ ফুর্তি। দুবাইয়ের রিয়েল এস্টেটের বড় একটা দাও মারলাম। বলেই দু’হাত দু’পাশে পাখার মতো নাচাতে লাগলো হায়াত।
– অভিনন্দন। আমি আজ এসেছি অন্য কারণে ভাইয়া, বলে সামনে আগাতেই বুঝলাম হায়াত কোকেন নিয়েছে একটু আগে। কারণ, টি-টেবিলে সাদা গুঁড়া পড়ে আছে এলোমেলো হয়ে। আর এসবের ব্যবসাও করে থাকে সে অনেক আগে থেকেই।
-অন্য কি কারণ?
– তোমার মেয়ের বয়সী একজনকে ধরে এনেছো তুমি, তোমার নোংরা চাহিদা পূরণের জন্য।
-ওরে আমার খোকারে, উ লে লে লে, তুই এখনও যে খোকাবাবু আছিস, বলেই আমার গাল টানতেই হাত ধরে ফেললাম।
– ভাইয়া, আমি মেয়েটাকে নিতে এসেছি। আর কিছু নয়, তোমার সাথে আমার যে ব্যবসায়ীক দ্বন্দ সেটা তুলে রাখলাম অন্য দিনের জন্য। কিন্তু আজ আমায় কোনো বাঁধা দেবেনা।
– বাঁধা দিলে? যদি দেই? হেই, কি করবি, কি করবি বল? বলে আমার বুকে ধাক্কা মারতে লাগলো।
– ভাইয়া, তুমি এখন নেশাতে আছে। আমরা পড়ে কথা বলবো, আমি যাচ্ছি সেই বাচ্চা মেয়েটাকে নিতে, কোনো বাঁধা দেবেনা। মুখ শক্ত করে ঠান্ডা চোখে বললাম আমি। হেঁটে যাচ্ছিলাম দোতালার সিঁড়ির দিকে যা কিনা ড্রইংরুম হতেই পেঁচিয়ে উপরে উঠে গিয়েছে।
কিন্তু এর আগেই হায়াত আমাকে আক্রমন করে বসলো।
আমি নিজেকে সামলেই বা’হাত দিয়ে তার চোয়ালে সজোড়ে মারলাম। সে থমকে গেলো, অবাক চোখে তাকিয়ে রইল আমার দিকে।
-তুই আমার গায়ে হাত তুললি শুয়োরের বাচ্চা, বলেই গা হতে স্যুট খুলে হামলে পড়লো আমার উপর। কবির এবং সাথের দু’জন শুধু চেয়ে দেখছে বিশাল দেহের একই রক্তের দু’জনের লড়াই। কেউ কারও থেকে কম নয়, কেউ কাউকে ছেড়ে দিচ্ছে না। লাথি দিয়ে হায়াতকে মাটিতে ফেলেই আমি নিজের স্যুট খুলে ছুঁড়ে মারলাম, আরও ভয়াবহ হুংকারে ঝাঁপিয়ে পড়লাম নিজেরই রক্তের সম্পর্কিত ভাইয়ের উপর। এখন সে ভাই নয়, সে পশু, মানবরূপী জানোয়ার। কবির বা অন্য কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসবেনা, কারণ এমনই নির্দেশ আছে তাদের। কিন্তু আমি আর থামাতে পারছিনা জানোয়ারটাকে। সে পাগল হয়ে উঠেছে, যেমনটা হয়ে থাকে পাগল কুকুর। সিঁড়ির কাঠের হাতলে মাথা ঠুকে দিলাম তার সজোড়ে। এক পাশ ফেটে রক্ত ঝড়ছে তার, আমার দিকে ক্লান্ত চোখে থাকিয়ে আছে। খেলা এখন আমার হাতে, বুকে সজোড়ে ঘুষি মারতেই সোফার উপর পড়লো। আর সাথে সাথে তার নজর গেলো সোফার এক কোণে পড়ে থাকা পিস্তলের দিকে। মানুষের চরিত্র কতই না অদ্ভুত! যখন ছোট ছিলাম, তখন আমার এই ভাইটা কতই না ঘুরিয়েছে কাঁধে নিয়ে। যা চাইতাম তাই দিতো, কোনো কিছুর জন্য তার নিকট কত আবদার করতাম। সব যেন চোখে ভেসে আসছে। আর আজ আমরা একে অন্যকে শেষ করে দেবার নেশায় মেতে উঠেছি। আমি একটি বাচ্চা মেয়েকে বাঁচাতে এসেছি সব ছেড়ে, আর আমার ভাই সেই বাচ্চা মেয়েকে ভোগ করতে চাইছে প্রয়োজনে নিজের রক্তের সম্পর্কিত ভাইকে মেরে।
আস্তে আস্তে তার পিস্তল উঠানো হাত দেখলাম।
বাড়ি কাঁপিয়ে দু’টো শব্দ হলো।
হায়াত বিস্ময়কর চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, আমার বাম হাতে ধরা রিভলবারের দিকে। সাদা স্ট্রাইপ শার্টের বাম পাশ হতে রক্ত রঙিন করে তুলছে শার্টের চারপাশ। মুখ দিয়ে শুধু একটিই শব্দ উচ্চারণ হলো,”মিজহাব”। হ্যাঁ, আমার নামটিই ছিল তার বলা শেষ শব্দ!
৫.
দরজা খুলবার শব্দ পেলাম।
এতক্ষণ চোখ বুজে ছিলাম। জ্ঞান হারিয়েছিলাম কি?
আস্তে করে ভেতরে যিনি এলেন, তাকে কেমন যেন দেখেছি বলে মনে হলো। হ্যাঁ, যে পশুটা তাকে ভোগ করবে তার সাথে এই লোকটার চেহারা অনেক মিল। কিন্তু চোখ দু’টো ভীষন রকমের ঠান্ডা, কেমন যেন তাকিয়ে থাকা যায়না বেশিক্ষণ। এসেই আমার মুখ হতে কাপড়টা খুললেন, হাত-পায়ের বাঁধন খুললেন। আমি আমার অঙ্গ-প্রতঙ্গের কিছু যে টের পাচ্ছি না। শুধু চোখ দিয়ে দেখছি নির্বিকারভাবে। আচ্ছা, এই লোকটা কি আমাকে ভোগ করবে? কিছু বলবার আগেই আমাকে সে দু’হাত দিয়ে তুলে নিলো। হঠাৎ আমার মনে হলো এই লোকটা আমার খারাপ কিচ্ছু করবেনা। খুব দ্রুততরা সাথে আমাকে কোলে নিয়ে নামছে লোকটি। আমি দু’হাত দিয়ে তার গলা জড়িয়ে রইলাম। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই দেখি সেই পশুটা আকাশের দিকে তাকিয়ে মাটিতে পড়ে আছে। আমি কি পাথর হয়ে গেলাম? আমার ভেতর কেন যেন ভয় বা অন্য কোনো অনুভূতি কাজ করছেনা। ভেতর ভেতর মনটা কেমন যেন হেসে উঠলো, বিজয়ীর এক প্রশান্তি নেমে আসলো বুকে। একজন পাশ হতে এসে একটি স্যুট দিয়ে আমাকে ঢেকে দিলো যার করো আছি তার নির্দেশে। এরপর সবাই দ্রুত হেঁটে চলেছে। বাইরে আজ জোছনা, চাঁদকে আজ অনেক বড় লাগছে। আমার চোখ বুজে আসতে চাইছে, কিন্তু আমি আমার বাহককে দেখে যাচ্ছি। কে এই লোকটি? আমি খুব ক্লান্ত বোধ করছি, খুব, খুব………….
৬.
মেয়েটি আমার গলা শক্ত করে ধরে আছে।
আমি তাকে দ্রুত গাড়িতে উঠিয়ে শুইয়ে দিলাম। মাথাটা রাখলাম আমার কোলের উপর। তার একটি হাত আমার হাত আঁকড়ে আছে।
– কবির, কুইক, সেকেন্ড হোমে চলো। আর জলদি ডাক্তার, নার্সকে হাজির হতে বলো।
গাড়ি ছুটে চলেছে আবারও দ্রুত, যত দ্রুত এসেছিলাম এর থেকেও দ্রুত……………………..
৭.
ঘুম ভাঙতেই দেখি কাল রাতের সেই লোকটা বিছানার পাশে সোফায় বসে আছে। সামনে চায়ের সরঞ্জাম সাজানো। তার পড়নে এখনও কাল রাতের পোশাক, সারারাত ঘুমায়নি বোঝা যাচ্ছে। এখন তার চেহারা দিনের আলোতে ভাল ভাবে দেখলাম। মুখে একটু স্মিত হাসি এনে আমার মাথার কাছে এসে বললো,
– বোন, কেমন লাগছে তোমার এখন?
আমি মনে হয় নিজের ভেতর নেই, কি করছি জানিনা ঠিক। আমি উঠেই জড়িয়ে ধরলাম তাকে, জড়িয়েই রইলাম তার বিশাল বুকে। চোখের পানি বাঁধ ভেঙ্গে উপছে পড়ছে শুধু। আমার মাথার ভেতর হালকা আজ, অনেক হালকা, অনেক প্রশান্তি। পৃথিবীর সবথেকে নিরাপদ আশ্রয় মনে হয় এই আমাকে বোন বলে ডাক দেয়া লোকটার বুক। আমার আর কোনো ভয় নেই, কোনো কিছুই আমাকে স্পর্শ করতে পারবেনা মনে হয়। আমি জড়িয়েই আছি, কেঁদেই যে আছি। পরম মমতা মাখানো একটি হাত মাথায় হাত বুলিয়ে যে আমাকে আরও প্রশান্তিতে বিছিয়ে দিচ্ছে।
৮.
ঠিক এক মাস পর।
আভাকে নিয়ে এলাম শহরের অদূরে অবস্থিত আমার একটি প্রজেক্টে। প্রধান সড়কের পাশেই এখানে রয়েছে বিশাল একটি জায়গা। এর বাজার মূল্য অকল্পনীয় রকমের।
এখানে একটি নতুন ফ্যাক্টরী উঠবে, তাই সাথে বেশ কিছু প্রকৌশলীও এসেছেন। অনেক সুন্দর একটি জায়গা, চারপাশে দেয়াল দিয়ে ঘেরা। এর মাঝে হরেক রকমের গাছ-গাছালী, আর একেবারে পেছনে বেশ বড় একটি পুকুর। আভা ছুটে বেড়াচ্ছে এখান থেকে সেখানে। আর আমি এখানে ভবিষ্যতে তৈরি ফ্যাক্টরীর প্ল্যান দেখছি। কিন্তু কাগজ হতে চোখ বারবার চলে যাচ্ছে মেয়েটির দিকে। সে পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে।
– তোমার এই জায়গাটা পছন্দ হয়েছে আপু?
– হ্যাঁ, কি সুন্দর জায়গা! মনে হচ্ছে কত আপন এই জায়গাটি! এমন জায়গাতে কেউ ফ্যাক্টরী করে ভাইয়া?
– কে বলেছে ফ্যাক্টরী হবে?
– তুমি না বললে আসবার সময়?
– ওহ, এখনও ঠিক হয়নি তো আপু। দেখি কি করা যায়। কয়েক মূহুর্তেই নেয়া নিজের চিন্তাকে প্রশ্রয় দিলাম একটি মিথ্যা কথার উত্তর দিয়ে।
-এখানে হবে একটি সুন্দর বাড়ি, যার বারান্দা দিয়ে পুকুর দেখা যাবে একদম কাছে থেকে। আর সামনে গাছ তো আছেই। ভাল হবে না ভাইয়া?
– হ্যাঁ, অনেক সুন্দর হবে। বলেই আভার চোখে মুগ্ধতার পরশ দেখে গেলাম নির্বাক হয়ে।
৯.
আমি এখন সব সময় ডায়রী লিখি।
মাঝে মাঝে মা’কে পড়তে দেই, আবার আব্বুকেও। আর এই লেখাগুলো রাখছি আমার ভাইটার জন্য। হ্যাঁ, আমার তো একটাই ভাই। সবাই চেনে মিজহাব বলে। কিন্তু আমার কাছে শুধুই আমার ভাইয়া। এখন আমার জীবনটা অনেক সুন্দর, ঠিক আগের মতই। আমার ভাইটা কিছুটা পাগল ধরনের। কখনও খুব নরম আবার কখনও ভয়ানক কঠোর। আর পাগল না হলে কেউ এত দামী সেই প্রজেক্টের জমি কি আমার নামে লিখে দেয়? আবার সাথে এটাও আছে যে , আমার তৈরি করা নকশাতে যেন সেখানে একটি দোতলা বাড়ি উঠে। আমি যেন দোতলাম বারান্দায় দাঁড়িয়ে পুকুর দেখতে পারি, প্রকৃতির রূপ দেখতে পারি। আমি মাঝে মাঝে আমার স্বপ্নের সেই বাড়িটির ছবি আঁকি। ঠিক এমনই একটি বাড়ি উঠবে সেখানে, যেখানে আমি থাকবো, ভাবতেই কেমন লাগছে। আমাকে বিদায় দেবার সময় ভাইয়াটা বলেছিলো যে, আর কখনও আমার সাথে তার দেখা হবেনা। আমি কোনো কথা বলিনি, শুধু তাঁকে জড়িয়ে ধরে চলে এসেছিলাম। তাঁর চোখের দিকে তাকাইনি, সেখানে কঠোরতা হয়তো দেখতে পেতাম। আমার কাছে যে সে শুধুই আমার ভাইয়া………….
মাঝে মাঝে চিন্তা করি, আমার নকশা করা বাড়িতে কোনো এক সময় আমার ভাইয়া আসবেন। এসে আমাকে আদর করবেন, তাঁর বিশাল বুকে আমি ঝাঁপিয়ে পড়ে কাঁদবো, হাসবো, ভালবাসবো, ভাইয়া ভাইয়া ডেকে যাবো।
পৃথিবীটা সত্যিই অনেক সুন্দর!