Latest Entries »

নকশী আমার চিত্রণে…

 

সাতসকালে বসে গেল চিত্রকর পূবেরই এক ঘরে। জানালা দিয়ে দেখা যায় দূর কোনো এক গ্রাম, পাশ দিয়ে যায় নদী। নদীর দিকে চোখ বুলিয়েই শুরু করে তার চিত্রণ।

আঁকছে সে তার মনের ছবি, মনের রঙে রাঙিয়ে। সময়ের সাথে সাথে মিশে যায় সে তার চিত্রেরই মাঝে। কোনো ক্লান্তি নেই, জড়তা নেই এঁকেই চলেছে চিত্রকর।

জীবন্ত হয়ে যায় চিত্র, চিত্রকরের তুলির ছোঁয়ায়। গাছের শুকনো পাতা উড়ে যায় কাশবনেরই মাঝে। বাতাসের পরশে মনের দোলায় নাচতে থাকে কাঁশবন। মুক্ত হয়ে আকাশপানে উড়াল যে দেয় কাশফুল।

আকাশপানে হাত-পা মেলে, নিচ জগতের আভা দেখে উড়তে থাকে সে কাশফুল। দূরদেশের এক অভিযানের, উড়ন্ত কিছু পাখি দেখে সে। পাখির দল ডানা ঝাঁপটিয়ে চলছে তাদের পথ নিরন্তর। হঠাৎ এক দেশে এসে, এক ছোট্ট পাখি হয়ে পড়ে দলছুট।
নেমে যায় নতুন এক দেশে, নতুন কিছুর দেখবার আশায়।

এক গাছের ডালে বসে পড়ে। গির্জার ঢং ঢং ঘন্টা শুনে। পাশের গির্জায় লোক হুলস্থুল। ব্যস্ত সবাই কারও অপেক্ষায়। কালো পোশাকের পুরুষ নামে, হাতে ধরা এক শ্বেত রমনী। শ্বেত পোশাক যেন তার রঙে গেছে মিশে। আনন্দিত সব তালি বাজায়। মেয়েটি ফুলের তোড়া ছুড়ে মারে। সেই তোড়াটি ধরার হিড়িক পড়ে।

কালো গাড়িটি চলছে ছুটে, গতি অনেক দুরন্তর। দু’পাশ শুধু সবুজ জমি। রাস্তা শুধুই খালি। নব্য বিবাহিত রমনী ওড়না দেয় বাতাসে ভাসিয়ে। ওড়না বাতাসে উড়াল দিয়ে, চায় আবার সেই রমনীর স্পর্শ পেতে। গাড়ি ছুটে যায় দুর্বার, নতুন এক গন্তব্যের আশায়।

ছোট্ট কিশোরী দৌঁড়ে বেড়ায়, সবুজ জমির মাঝখানে। হঠাৎ এসে সেই ওড়না জড়িয়ে ধরে, আগলে ধরে মমতায়। ওড়না জড়িয়ে জমির মাঝখানে, কিশোরী দাঁড়ায় দু’হাত মেলে। মেঘ জমেছে আকাশে। বৃষ্টি হবে শেষ বেলাতে। কিন্তু মেঘ শুধু মুচকি হাসে। ভাবছে, খুকি বোঝ কি আমার মনে আছে?

মেঘ হতে মুক্ত হয়ে বৃষ্টি নামছে পৃথিবীর তরে। কে ছুঁবে প্রথম কিশোরীর হাত, এই নিয়ে হয় বৃষ্টির প্রতিযোগীতা। কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির অনুভবে, কিশোরীর মন নেচে উঠে। দু’হাত মেলে দৌঁড়ে যায়, জমির ফসল মাথা নাড়তে থাকে কিশোরীর আনন্দে।

মেঘ উড়ে যায় দিগন্তপানে। ভেসে চলে যায় দূর এক দেশে।
সবুজ যেখানে আছে শুধু তারই অপেক্ষায়। থাকুক অপেক্ষায়, বিনা কারণে দেবো কেন বর্ষা, ভাবে শুধু মেঘ।

সবুজ ফসল আকুতি জানায়, কিন্তু কেউ শুনেনা সেই আহবান।
মেঠো পথে বাউল এসে যায়। বেজে উঠে তার একতারা। স্নিগ্ধ হয়ে যায় আকাশ বাতাস, মোহিত হয় মেঘমালা। ঝর ঝর করে নেমে পড়ে মেঘের সব কথামালা। ফসল শুধু দেহ নাড়িয়ে কৃতজ্ঞতা জানায় বাউলকে। বাউল শুধু গান গেয়ে যায়, পথ হেঁটে যায় কোন এক অজানায়।

মেঠো পথের ফুলের মাঝে, ফড়িং থাকে আর প্রজাপতি। রঙিন প্রজাপতি উড়ে চলে যায়, সাথে নিয়ে যায় ফুলের সুবাস। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে খোলা জানালায় প্রবেশ করে। ঘরময় শুধু ঘুরে বেড়ায়। ক্লান্ত প্রজাপতি আলতো করে যায় মিশে রঙিন ক্যানভাসে ।

চিত্রকর তুলির শেষ আঁচড়ে প্রজাপতির ডানা এঁকে দেয়।
শেষ করে তার চিত্রণ। একবার দেখে নেয় তার সৃষ্টি, ঠোটের কোণে হাসি ফুটে দেখে নিজের কর্ম। দেয়ালেতে ঠাই হয় সেই রাঙানো চিত্রণ।

কফির মগে চুমুক দিয়ে আবারও চোখ বুলায় চিত্রকর তার কর্মের দিকে।
সন্তুষ্টিতে আসে তার প্রফুল্লতা। নিয়ে বসে যায় আবারও এক সাদা ক্যানভাস। নতুন বর্ষের চিত্র তো শুরু হবে এখন। আগের বর্ষের তো হল মাত্র শেষ। দেয়ালেতেই আছে সেই আগের বর্ষের চিত্রণ।

চিত্রকরের নকশী শুধু থাকবে যে তার চিত্রণে।

[ ২০১০ সালে ব্লগে প্রকাশিত ]

 

মৃত পবিত্র

 

দিন কেটে যায়, জীবন এঁকে যায়,

যাক না বয়ে সে অলীক বাষ্পের ধারা।

ছুঁড়ে দেই সুখ অথবা কোনো ভোগ,

ঠিক যেন ক্ষুধার্ত কুকুরকে ছুঁড়ে দেয়া বাসি রুটি।

ঠিক তেমনই ছুঁড়ে যেন দিয়েছিলেন ঈশ্বর আমাদের,

যেমনটি ছুঁড়েছিলাম রুটি।

 

কিংবা লোভে যেন খেলেছিলাম জুয়া,

যেমনটি খেলেছে ঈশ্বর সকলকে নিয়ে প্রতি নিয়ত।

রক্ত ছাড়া আর কি বা বইবে,

ঈশ্বর, তোমার যে চোখে শুধু পাথরের দৃষ্টি।

তবু তোমার ঘরে আছড়ে পড়ে সকলের মন.

ঘরের কত রূপ তোমার?

মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা? নাকি অন্যকিছু?

 

একবার করে দেখো মন আমাদের মতো!

চিৎকার ছাড়া আর কিছুই পারবেনা।

মাটি থেকে যখন বানিয়েছিলে,

মনটাও ছিল আমাদের মাটি।

কিন্তু আজ তোমার পাথর চোখে তাকিয়ে,

আমরাও হয়েছি পাথর হৃদের অধিকারী।

 

নদীর রুক্ষতায় যেন পাই তোমার নিঃশ্বাস,

নীচ হতে নীচতর সে স্রোতের মতই যেন গভীর।

আরও কি গভীরতার প্রয়োজন তোমার?

আমাদের ব্যথার সাগর যে আরও গভীর ঈশ্বর।

তুমি কি চাও সেখানে করতে স্নান?

তুমি থাকো ঠিক তোমারই ন্যায়।

ঘুমাও তুমি, ঘুমাতে দাও আমাদের।

আর আমার কিছুই বলবার নেই।

 

তোমার কথা সব নক্ষত্রে লিখিত হবে,

একটি ক্ষত-বিক্ষত, রক্তাক্ত হৃদয় দিয়ে।

ঘুমাও তুমি, তুমি ঘুমাও……………..

 

 

আমি জন্ম নেবার প্রথম যখন ডাক শুনেছিস তুই,

বলনা আমায় একটি বার কোথায় এখন তুই?

ছোট্ট হলে বলতো কেউ ওই আকাশের তারা,

যখন কেউ নেয় যে বিদায়, তারা হয় ওরা।

আমি তো আর ছোট্ট নই, নই যে আমি খোকা,

তবু কেন লুকিয়ে থেকে আমায় করিস বোকা।

তোকে খুঁজি প্রতি বেলায় শুকনো আমার চোখে,

মা তুই ডাকিসনা যে, চেপে রাখ না আমায় তোর বুকে।

 

সাঁঝ প্রহরে ফিরি আমি আর তোর মুখ মুখটি ভাবি,

খুব করে যে খুঁজে ফিরি তোর ভালবাসার চাবি।

মমতার সেই সিন্দুকটি মরচে হয়ে কোণে,

রাত প্রহরেও দেয়ালগুলো আমার মা ডাকটি শোনে।

মা তুই আয় না এবার, একবার বল, খাইয়ে দিবি তুই,

মুখটি মুছে আমি এবার তোর কোলেতে শুই।

ডাকিস না তো আদর করে, কোথায় তুই থাকিস,

মা তুই অচেনা দেশেও থেকে কি আমায় ভালবাসিস?

 

তোর ছেলেটি নেই যে আর আগের মতো পাজি,

তুই একবার ডাক, তোর ছেলে যে মরতেও শত রাজি।

সবাই ভাবে তোর ছেলেটি রাজা কিবা রাজন,

আমি যে মা তোর সেই ছেলেটি, আমি তোর মোহন।

পারিস শুধু দূর হতে চুপটি করে দেখতে,

যাবিই যদি নিয়ে যেতি, পারতাম তোকে দেখতে।

মা তুই জানিস আমি কত ভাল একবার যদি আসতি,

লক্ষী হয়ে মা ডাকতাম অশ্রু চোখে দেখতি।

 

পেটের ক্ষুধা মেটে তবু মনের মেটেনা,

হৃদয়ের ক্ষরণে মাগো ব্যথা সয়না।

তুই বকিস আমায়, রাগিস অনেক, তবু একবার তো আয়,

মা তুই কপালে চুমোস, জড়িয়ে ধরিস, ছাড়িসনা আমায়।

কিভাবে থাকিস একলা একা, কষ্ট লাগেনা,

সব অশ্রু ঝড়ে পড়েও অশ্রু শুকোয়না।

 

জ্বরের বেলায় কাঁপিরে মা, তোর নামটি ডাকি,

তবু তোর হয়না মায়া, দিয়ে গিয়েছিস ফাঁকি।

বুকের ভেতর ব্যথা জাগে, কপালে নেই যে হাত,

মা তুই আছিস কোথায়, কেমন আছিস ভেবে কাটাই রাত।

আজ যদি মা থাকতি তুই, পাশে থাকতি বসে,

বলতি তখন ভুল আমারই, জ্বর যে আমার দোষে।

 

শুনিসরে মা, ডাকি আমি, আয় না আমার বুকে,

তবু কেন চুপটি থাকিস, হৃদয় শুষে জোঁকে।

রূপোর নুপুর আমি তোর দেবো সোনায় মুড়িয়ে,

ছোট্ট মেয়ে হয়ে তুই দেখাবি সেটা ঘুরিয়ে।

আগলে রবি তুই আমারই এই বিশাল বুকে,

পালাবি না, আটকে দেবো, আমার দুই চোখে।

চোখের কড়া ভেঙে তুই গেলি কখন পালিয়ে,

মা তুই পালাবি যখন কেন দিলি হৃদয়টা আমার গলিয়ে?

 

মা তোর মোহন ডাকে, একলা রাতে বসে,

তোর তো ব্যথা হয়না আর রাত কি দিবসে।

আর সয়না ব্যথারে মা, একবার শুধু আয়,

একলা কেন থাকবিরে তুই, নিয়ে যা এই আমায়।

মা তুই বড্ড বোকা, তাই না হলে এমন কেউ করে,

কতবার ডাকি তোকে, কত যে গানের সুরে।

মা, তোর মোহন ডাকে,

ও মা, তোর মোহন ডাকে………………

 

 

কিছু আলো কখনও অন্ধকারকে বাঁধা দিতে পারেনা,

কিছু আলো কখনও অন্ধকারকে অতিক্রম করতে পারেনা।

কিছু গান কখনও কবিতায় লেখা হয়না,

কিছু কবিতা কখনও গান হতে পারেনা।

মাথা নুয়ে আসে, আমরা কতক ক্লান্ত পথহারা যেন,

পথ হারিয়েও আমরা স্রষ্টার দেখা পাই না।

 

সূর্যের আলো নেভেনা,

আগুনের তাপ কমে আসেনা।

কিছু আগুন যেন সূর্যের তাপকেও হারায়,

কিছু রৌদ্র আগুনকেও স্তিমিত করতে জানেনা।

আমাদের ভেতরের আগুনে চলে চালিকা শক্তি,

আগুনের মতো হালকাতে যেন গর্ভায় অভিশাপ।

কিছু অভিশাপ আগুনের তাপ সহ্য করতে পারেনা,

কিছু অভিশাপ যুদ্ধ হতে শান্তিতে পরিণত যে হয়না।

 

পাহাড়ের অহম যেন তার চুড়োতে,

কবরের অহম যেন তার ফলকে।

খাদ্যের অহংকার ক্ষুধাতে,

আর ক্ষুধার অহংকার দারিদ্রতাতে।

কিছু ক্ষুধা যেন খাদ্যে পরিপূর্ণ হয়না,

কিছু খাদ্য শুধু দারিদ্রতাকে মেটাতে পারেনা।

ভালবাসায় ফিরি আমি পূর্ণাঙ্গ রূপে,

আমায় যেন প্রেরিত সেই ভালবাসায় ফিরিয়ে নিতে।

নতুন করে ভাবি,

নতুন করে ভাবতে শিখি।

কিছু ভাবনা ভালবাসাকে ফেরাতে পারেনা,

কিছু ভালবাসা শুধু ভাবনায় রঙিন হয়না।

 

ভালবাসায় সাদা রঙে আঁকি ছবি,

আকাশের ক্যানভাসে এক মৌন যুদ্ধের ছায়া।

সেই ছায়াতেই উড়ে যায় সাদা কোন পাখি,

যুদ্ধ শেষে কেউ শুনতে কি পায় সেই পাখির ডাক?

আঁধার, শুধুই আঁধার।

কিছু যুদ্ধ কখনও ভালবাসাকে হারাতে পারেনা,

কিছু ভালবাসা কখনও যুদ্ধকে জয়ী হতে দেয়না।

কিছু আলো কখনও অন্ধকারকে বাঁধা দিতে পারেনা,

কিছু আলো কখনও অন্ধকারকে অতিক্রম করতে পারেনা।

আর কিছু অন্ধকার কখনও আলো হতে পারেনা।

 

[  ২০০২ সালে এই কবিতাটি লিখে ছিলাম ডায়রির পাতায়। আজই প্রথম শেয়ার করলাম সকলের সাথে। তখন বয়স কম ছিলো, তাই হয়তো কবিতাটিও তেমন একটা পরিপক্ক নয় ]

চাঁদ ডুবে তার চোখের কোণে,

মন মাতানো সে কদম বনে।

কদম ফুলের আভাসে হরন,

যায় হেঁটে দুই পাগলা চরণ।

চরণদাসের মন হরনে চোখের কোণে অশ্রু আসে,

বাঁশবাগানের পুকুরে যে তারার সাথে জোছনা ভাসে।

 

চাঁদ ডুবে তার চোখের কোণে,

সেথায় হারাই ভাঙ্গা স্বপনে।

স্বপন ভাঙ্গে আর ভাঙ্গে ঘোর,

পাখির ডাকের ঝাপটানিতে আর জাগে ভোর।

ভোরের রেখা ফুটবে কখন,

কাঁজল মায়া চোখ খুলবে যখন।

সেই চোখেতে আলোক ছটায়,

লক্ষ তারার ঝলক  হটায়।

আমি ডুবি কোন সাগরে,

ডুবতে থাকি তৃষ্ণা ভরে।

 

ক্ষুধ পিপাসা সব ভুলে যাই,

কাঁজল চোখের মনে দেখা পাই।

চোখ ছিল তার সাগর কণা,

প্রেমে হারালো অবুঝ মনা।

সূর্য ডুবে, ডুবে পাখি,

তবু ডুবে না সে কাঁজল আঁখি।

 

জোছনা খোলে পাখা মেলে,

ঠান্ডা হাওয়ায় চাঁদ যে দোলে।

হারানো মনে যে চিত্র আঁকা,

মুছে দিয়ে আঁকে কাঁজলরেখা।

আমি হারাই কোন সে বনে,

তবু খুঁজি আমায় প্রতি ক্ষণে।

কোথায় চাঁদ, কোন বা সনে,

চাঁদ ডুবে তার চোখের কোণে।

স্মৃতির নেশা

বিনিদ্র রজনীতে বিনিদ্র মন,

বারান্দায় দাঁড়িয়ে খোলা হৃদয়ের খেঁড়োখাতা,

টি-টেবিলে রাখা গরম কফির মগ হতে উড়ে আসা কড়া ঘ্রাণ,

আর সাথে কালো হয়ে আসা মেঘের গর্জন।

 

সবকিছু আঁধারে ছেয়ে যায়,

তবু মন উজ্জ্বল কোনো স্মৃতির পাতায়।

সেথায় উড়ছিল তোমার স্কার্ফ তীব্র হিমেল হাওয়ায়।

আমি শুধু দেখছিলাম বাতাসের সেই ছেলেখেলা,

আর ছিল হাতে তোমার হাত।

তখনও ঠিক হারাইনি কেন তোমার দু’চোখে?

ভয় ছিল, স্মৃতির বুকেই স্মৃতিকে বিনাশের ভয়।

 

আরও ভেসে আসে স্মৃতির চির উজ্জ্বল দৃশ্যে,

পাহাড়ের সেই দুর্গম দূর্গেতে একাকী, নিঃসঙ্গতায়,

তোমার সাথে আমার প্রথম একাকী কথা বলা,

কত কিছু বলা, কত বেদনার মেঘ উড়ানো।

তুমি সব এক ঝড়েই ভাসিয়ে দিলে,

ভালবাসার বর্ষাতেই আমায় সিক্ত করলে।

স্বর্ণরাঙা আলোতে আমার মন যেন রাঙালে।

সাগরনীল নয়নের স্রোতে আমায় যেন ভাসালে।

 

মেঘের গর্জন ঘন হতে থাকে,

কফির মগ হতে আর ধোঁয়া উড়েনা।

স্মৃতির পাতায় আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পড়ে।

কলম থেমে থাকে ডায়রির মাঝ পাতায়……….

 

 

মনঃ সরোরুহ

 

মনঃ সরোরুহ

 

একটি পাতা ঝরলেও যেন শব্দ হবে ঠিক এমনই শান্তভাব বিরাজ করছে পুরো বাড়িটিতে।

শুধু আমার দোতলার ফ্ল্যাটেই যেন হলুদাভাব দেখা যাচ্ছে। দরজা খুলে নিচতলার অন্ধকার হতেই ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম উপরে। দোতলার সুদৃশ্য ড্রইংরুমের হলুদাভাবের রহস্য উন্মোচিত হলো। সারা দোতলা ছেয়ে আছে মোমের আলোতে, প্রতিটি কোণে। আর কেমন মিষ্টি একটি ঘ্রাণ আসছিলো নাকে, ধীরে ধীরে তা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। এই ঘ্রাণ আমার পরিচিত, অনেক অনেক পরিচিত ছিল এক সময়। চোখ বুজেই অনুভব করতে পারতাম। কিন্তু আজ আর চোখ বুজতে হয়নি। ওই তো, ওই তো সে এগিয়ে আসছে!

 

বাসন্তী রঙের শাড়ি আর বেলী ফুলের সাজ খোঁপাতে, আর হাতে?

সব সময়ের মতই সেই সাধারণ কিন্তু রিনিঝিনি শব্দের ঢেউ তোলা কাঁচের চুঁড়ি।

চোখের কাজলটা ঠিক আগের মতই আছে। আর হাসিটা যেন আরও উজ্জল হচ্ছে তার। আমার পাশ কেটে যেয়ে সোফাতে বসেই বলল,

  • অবাক হয়ে আছো যে?

আমার নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা দেখেই হয়তো উঠে কাছে এলো সে।

  • এতো চুপ কেন তুমি?
  • তোমাকে দেখছি।
  • আমাকে দেখতে ইচ্ছে করে কি তোমার?

কোনো জবাব না পেয়ে নিজেই আবার যেয়ে বসে পড়ে আগের জায়গাতে। লক্ষ্য করলাম, তার পাশে পড়ে আছে অনেকগুলো কাগজ, কিছু খামে, কিছু বা ভাঁজ খোলা হয়ে। তার আলতা রাঙা দুপায়ে নূপুরের শব্দ যেন আমাদের এই নিঃশব্দতাকে আলোড়িত করছিল তার ঝুনঝুন শব্দের জানান দিয়ে। পুরো প্রেক্ষাপট যেন বিষন্নতায় ঘেরা। আরও বিষন্ন যেন ছিল তার চোখ জোড়া।

 

  • তোমাকে আজ কিছু চিঠি পড়ে শোনাতে এসেছি।
  • হুমম।
  • তুমি কি দাঁড়িয়েই শুনবে।
  • হুমম, আমি তো জানি কি লেখা আছে সেখানে। সব তো আমারই লেখা।
  • না, সব তোমার লেখা নয়, কিছু আমারও আছে।
  • সেগুলোও তো আমার মুখস্থ, প্রতিটি লাইন, প্রতিটি শব্দ, সব মুখস্থ।
  • না, সব নয়, কিছু চিঠি আছে যা কখনও আমি তোমাকে দেইনি। শুধুই আমার লকারে পড়ে ছিলো, গোপনে, কোনো এক কোণে।
  • আমাকে কখনও যে সেগুলো দিলেনা?
  • কিভাবে দেবো? সময় যে ছিলো না আর।

 

একটি কাগজ তুলে নিয়ে পড়া শুরু করলে সে, “ আমার লেখা দশম চিঠি তোমাকে। কিভাবে যেন দশটি চিঠি লেখা হয়ে গেলো তাই না। কিন্তু ইচ্ছে কি হয় আমার জানো? প্রতিটি ঘন্টাতেই যদি একটি করে চিঠি লিখতে পারতাম তোমায়, হয়তো মনের কথা সব আসতো না হাতের লেখাতে, কিন্তু তোমাকে নিয়ে লিখতে তো পারতাম আরও। আমার শেষ দিন পর্যন্ত ……….”

 

তাকে থামিয়েই নিজে বলতে শুরু করলাম, আমার শেষ দিন পর্যন্ত আমি তোমায় নিয়ে হয়তো লিখতে পারবোনা। কিন্তু আমি তখন তোমায় নিয়ে পড়ে যাব এই চিঠিগুলো। যদি সম্ভব হয়, কোনো এক পাহাড়ের গায়ে ক্লান্ত কোনো বিকেলে আমি তোমায় পাশে নিয়ে বসে পড়ে শোনাবো এই পত্রগুলো। আর যখন বাতাসে তোমার চুল এলোমেলো করে দেবে, আমি তখন কোনো এক চিঠি হাতে নিয়ে বসে দেখে যাবো তোমাকে। সেই দৃশ্যটি হয়তো লিখবে পত্র আমার দুচোখে। আর তুমি যখন কাঁধে মাথা রেখে আমার হাতে ধরা চিঠি পড়বে, আমি তোমার খোঁপার ফুলের ঘ্রাণে হারিয়ে যাব।”

 

  • তোমার লাইনগুলো মনে আছে?
  • হুমম, আছে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের অন্ধকার দেখতে দেখতেই বললাম।

বেশ কয়েক মূহুর্ত চুপ থেকে আবারও বলল সে,

    • তোমার এই চিঠিটি মনে আছে? যেখানে তুমি আমাকে নিয়ে প্রথম কবিতা লিখেছিলে?
    • ভুল। তোমাকে নিয়ে আমি প্রথম কবিতা লিখি আরও আগে। এটা ছিল তোমাকে লেখা কোনো চিঠির মাঝে প্রথম কোনো কবিতা। বলেই তার দিকে মুখোমুখি তাকালাম।

 

পড়তে শুরু করলো সে অন্য একটি চিঠি নিয়ে, “ আমার প্রভাত, কেমন আছো? প্রভাতই তো তুমি আমার, জীবনটা কেমন যেন আলো হয়ে উঠেছে। হয়তো নতুন সূর্য এনেছো জীবনে তুমি। আর…………”

 

আর প্রতিটি প্রভাতে যেন আমি তোমার স্নিগ্ধতা পাই অজানা কোনো এক মাধ্যমে। আমার রন্ধ্রে যেন তোমার নামটি ঘুরপাক খাচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমার সূর্য কখনও ডুবেনা। প্রাকৃতিক নিয়ম তো চলবেই, কিন্তু আমার মনের প্রকৃতি যে তোমার মেঘ মন বা হিমেল পরশের ছোঁয়াতেই পরিপূর্ণ। হারিয়ে যেও না কখনও, মনের এই প্রকৃতি তখন তছনছ হয়ে যাবে। প্রলয় যে গ্রাস করবে মনের সব ভালবাসার দ্বীপকে, ডুবে যাবে সব বিষন্নতার সাগরে। তোমার জন্য আমি কাঁচের চূঁড়ি এনে রাখি গোপনে। কখনও তোমাকে দেই, কখনও তোমাকে দেবো বলে রেখে দেই নিজের কাছে। মাঝে মাঝে দেখি সেই চূঁড়িগুলো হাতে নিয়ে। তোমার স্পর্শ যেন ধরা দেয় তখন।”

 

এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলে গেলাম সেই লাইনগুলো।

 

  • এখনও আছে সেই চূঁড়িগুলো? কেমন এক মায়া চোখে যেন আর জিজ্ঞাসা।
  • আছে, সব আছে।

নিজেকে যেন সামলে নিল একটু। এরপর বলল আরেকটি কাগজ হাতে নিয়ে,

  • এখন শুধু আমি পড়ি, তুমি শোনো।

 

তোমার জন্য আজ চকবাজারে ঘুরে ঘুরে নানান দোকান হতে কত চূঁড়ি যে কিনেছি! তা যদি দেখতে! আমি কবে দেবো তোমাকে এগুলো জানো? যেদিন তুমি প্রথম আমার জীবনসঙ্গী হয়ে আমার গৃহে প্রবেশ করবে। বাসর রাতে আমি তোমার হাত শুধু সাজাবো নানা রঙের ছূঁড়ি দিয়ে। তোমার চূঁড়ির শব্দ যেন আমায় কেড়ে নিয়েছে ঠিক সেদিন যেদিন আমাদের প্রথম দেখা। নীল ছিল তোমার চূঁড়ি, নীল ছিল তোমার শাড়ির রং। আমার এসব দৃশ্য বারবার কেন চোখে ভাসে? আচ্ছা, কখনও যদি তোমাকে না পাই, তখন কি হবে? তোমার চূঁড়ির রিনিঝিনি শব্দ কিভাবে ভুলবো আমি? আর সেই রূপোর নূপুরের ঝুনঝুন সুর? আমি তোমাকে ছাড়া আর ভাবতেও চাইনা। সবসময়ই রবে, তোমার ভালবাসা নিয়েই রবে।”

বলে চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। এরপর একটি হাত উঁচিয়ে চূঁড়ির রিনিঝিনি শব্দ তুলে বললো,

  • ঠিক এগুলোই কি ছিল?
  • হ্যাঁ, এগুলোই ছিল। তার হাতে বাসন্তী রঙের চূঁড়ির দিকে তাকিয়ে বললাম।
  • আমার কথাগুলো মনে আছে তোমার? শেষ কথাগুলো।
  • মনে আছে। বলেছিলে,

    যখন আমি চলে যাব, তখন যত ব্যথাই পাও আমাকে ভুলে যেওনা। যখন সাঁঝের বেলা পরন্ত হবে, তখন ভেবো আমি তোমার ঠিক কাছে আছি। আর কাউকে তাড়াতাড়ি নিজের জীবনে জড়িওনা। তাহলে পরে কষ্টই পাবে। যখন আর চোখ বুজলে আমার মুখখানি ভেসে উঠবেনা, তখন আমাকে ভুলে যেও। নিজের জীবনে ভালবাসা নিয়ে এসো অন্য কারও। যে কিনা ভালবাসবে তোমাকে আমার থেকেও অনেক, অনেক….”

 

  • মনে আছে সব?
  • আছে, সব আছে।
  • এখন আমার একটি অজানা চিঠি শোনাই তোমাকে। যা কখনও তোমাকে দেয়া হয়নি আগে। বলেই পড়তে লাগলো সে,

প্রিয় মানুষকে যে কত ভাবে মন ডাকে, কিন্তু কিছু বলবার বা লিখবার সময় কিছু যেন বলা হয়ে উঠেনা। কত চিঠি তুমি আমাকে দিয়েছো। কিন্তু আমি সেভাবে দেইনি। আমার সময় খুব বেশি আর নেই, আমি বুঝতে পারি সব। কিন্তু আমি কেন যেন অনেক সুখী হয়ে মরতে পারবো। কারণ কি জানো? আমি তোমার ভালবাসার পরশে আগলে ধরেই বিদায় নেবো পৃথিবী থেকে। আমার এই কথাগুলো কখনও তুমি জানবেনা, আমি জানতেও দিতে চাইনা। তবে তোমার চিঠিগুলোকে প্রতিনিয়ত যে আমি অনুভব করবো। তোমার ভালবাসার নিংড়ানো শব্দগুলোকে আমি কেন নিয়ে যেতে পারবোনা বলতো? এর কি জবাব হবেনা? তবু আমি থাকবো তোমার মাঝে। আর যদি কখনও আমাকে ভুলে যাও, আমি হাসি মুখেই বিদায় নেবো তোমার মন হতে। কারণ, আমি তোমায় অনেক ভালবাসি।”

 

 

  • চোখ বুজলে এখনও আমায় দেখো? অশ্রুভেজা নয়নে আমার দিকে তাকাল সে।

আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিছু যেন আটকে আছে আমার গলার মাঝে।

  • উত্তর দিলেনা যে? দেখতে পাও কি আমায় এখনও চোখ বুঝলে?

আমার নিঃশব্দতায় যেন তার ঠোঁটের কোণে একটু হাসি এঁকে গেলো।

  • তুমি চোখ বুঝলে ঠিক এই ছবিটিই দেখতে পাও, তাই নয় কি? বলেই একটি ছবি সে তুলে ধরলো।

 

হলুদাভাবটা যেন ড্রইংরুমে আরও বেড়ে উঠলো। এর মাঝে সে আছে যেন কোনো এক দেবীরূপে। আর হাতে ধরা ছবির দিকে আমার দৃষ্টি।

 

এক জোড়া সাগরনীল চোখ তাকিয়ে আছে সে ছবির দৃশ্যে।

বাতাসে এলোমেলো হয়ে এক ওড়না বা যেন তার মুখ ঢেকে আছে। শুধুই চোখ জোড়া দেখা যাচ্ছে।

 

  • তুমি এই দৃশ্যটিই দেখতে পাও চোখ বুজলে।
  • আমি জানিনা।
  • তুমি জানো।
  • এটা তো তোমার ছবি।
  • না, আমার নয়। ভাল করে দেখো। এর চোখ সাগরের মত নীল। আকাশের সম মায়া নিয়ে তাকিয়ে আছে।
  • তোমার চোখও তো নীল।
  • না, আমার চোখ নীলাভ। আর এই ছবির মেয়েটির সাগরের মত নীল। তুমি চোখ বন্ধ করলেই তাকে দেখতে পাও। আমাকে আর নয়।
  • আমি তোমাকে ভালবেসেছিলাম।
  • আর তুমি তাকে এখন ভালবাসো।
  • আমি তোমায় পেতে চেয়েছিলাম।
  • তুমি এই ছবির মেয়েটিকে ভুলতে চাইছো, কিন্তু পারোনা।
  • আমি তোমায় নিয়ে এখনও লিখি।
  • তুমি আমায় নিয়ে চিঠি লিখোনা। সব তাকে নিয়েই লিখো। তুমি নিজের অস্তিত্বকে হেয় করে চলেছো। আর নিজের মনকেও।
  • কিভাবে?
  • নিজেকেই প্রশ্ন করে দেখো।
  • আমি জানিনা।
  • আমি অতীত, আমি কালের গর্ভে বিলীন।
  • এভাবে বলোনা। আমার কষ্ট হয়।
  • সাগরনীল চোখের মেয়েটির কাছে আমি হার মানলাম।

 

ধীর পায়ে এগিয়ে হাতে ধরা চিঠিগুলো আমাকে ধরিয়ে দিলো সে।

পুরোনো সেই চিঠিগুলো হাতে নিয়ে মনে পড়ে গেলো কত কিছু! আর ভেসে আসছিলো চোখে কত পুরোনো কিছু স্মৃতি। এর মাঝেই রয়ে গেছে সেই ছবিটি, সাগরনীল চোখের অধিকারিণী যেন কোনো এক মায়ায় তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

 

চিঠিগুলোর দিকে তাকিয়ে রই।

না, চিঠির দিকে নয়। সেই ছবিটির দিকে।

পিছু ফিরে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই।

 

একা আমি দাঁড়িয়ে রই অতীতের সব পত্র হাতে। আর একহাতে ধরা থাকে কোনো এক সাগরনীল চোখের ছবি।

 

 

 

ছায়া রাত

১.

চোখটা আটকে আছে দরজার দিকে।

বিছানায় মুখ বাঁধা, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আমি পড়ে আছি। অপলক, অনুভূতিহীন চোখে তাকিয়েই আছি। এক একটি সেকেন্ড যাচ্ছে যেন শম্বুক গতিতে। আর কত সময় থাকবো আমি এভাবে পড়ে? আর কতক্ষন পর আমার দেহে আক্রমন  হবে সেই হিংস্র পশুর দ্বারা?  এই আমার কি আজই পৃথিবীর শেষ রাত? আজই কি আমার আভা নামটি মুছে যাবে চিরতরে? আমাকে কি বেঁচে রাখবে? নাকি ফেলে রাখা হবে কোনো আবর্জনাতে ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায়? এই জগতটাই যে আবর্জনার স্তুপ, বড় নোংরা কলুষিতময় এই জগত। আর যদি বেঁচে থাকি, তখন? নাহ, আমাকে বাঁচিয়ে রাখলেও আমি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবো না। এই জগতের প্রতি আমার নির্মম প্রতিশোধ হবে নিজেকে হন্তা করে। এই হবে আমার পরিণতি।

 

কিন্তু আমি কি এমন চেয়েছিলাম?

আমি তো এই সতের বছরের জীবনে সব সময় শুনে এসেছিলাম, জগত অনেক নির্মম, অনেক কঠিন। হেসে-খেলে যে যাচ্ছিল সময়। কত আদর ভালবাসায়! কত স্বপ্ন ছিল, কত সুন্দর ভবিষ্যতের আল্পনা ছিল কল্পনার দেয়ালে। জেলা গার্লস স্কুল হতে এ+ পেলাম। এখনও মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা, স্কুলের সংবর্ধনার কথা। নিজের শেষ দিনটিতে বোধহয় আজ সব চোখে ভেসে যাবে। আমার মা’কে খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে, বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে।

মা….মাগো, আমাকে বাঁচাও, আমি যে নরকের দরজায় এখন মা। একটু পর এক হায়েনা যে আমায় নরকের আগুনে পোড়াবে মা…………..

 

২.

গাড়ি শো শো করে চলেছে।

সামনে দু’টো, পেছনে দু’টো, আর মাঝে আমার গাড়ি। রাত একটার মতো বাজে, তবু কেমন যেন মনে হচ্ছে সারা পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে। গাড়ির সাথে বাতাসের ঘর্ষনের শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ পাওয়া যাচ্ছেনা। ড্রাইভার কঠোর নজরে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে, আর তার পাশে আমার পিএ এবং সকল কর্মের ডান হাত কবির বসে রয়েছে নির্লিপ্তভাবে। একে একে হয়তো ছক সাজাচ্ছে, কিভাবে কি হলে সব সুরাহা হবে। আর আমি? কালো জানালার ভেতর হতে  রাস্তার পাশের অন্ধকার দেখে চলেছি। শহর হতে আসা দু’ঘন্টার পথ প্রায় শেষ, আর একটু পরই পৌঁছাবো এক বাগানবাড়িতে। বের হয়েছিলাম নিজের ক্ষমতার প্রদর্শনের জন্য, অনেক কিছু নিজের আয়ত্ত্বে আনবার জন্য। কিন্তু বিধাতার পরিকল্পনা ছিল যে অন্য কিছু। হঠাৎ কবিরের ফোন বেজে উঠতেই সে আমার দিকে ফিরে মোবাইলটা এগিয়ে দিলো। কানে ধরতেই এক কুৎসিত হাসির সাথে শুনলাম,

 

– কিরে আমার ছোট খোকা, কই তুই? আর কতক্ষণ?

– আর বেশিক্ষণ লাগবেনা, পাঁচ কি সাত মিনিট?

– জলদি আয়, আমার নেশা উঠে গেছে চরমভাবে, হে হে হে, আর অন্য নেশাও যে চেপে রাখতে পারছিনা।

– আমি আসছি ভাইয়া, তুমি মদ বেশি পান করোনা। আমি আসছি।

– আয় আয়,আমি তো তোর অপেক্ষাতেই আছিরে মিজহাব। বলেই লাইন কেটে যায়।

 

অপেক্ষা।

এমন দিনের জন্য ছিল আমারও অপেক্ষা। যখন হারানো ক্ষমতা এবং সবকিছু উদ্ধার করি, তখন থেকেই পণ, নিজের এই ফুপাতো ভাইকে হটিয়ে অদৃশ্য সাম্রাজ্যে নিজেকে আরও উঁচুতে বসাবো। সব দখল করে নেবো, সব। আজ ছিল তেমনই একটি দিন। কিন্তু পৃথিবী থেকে সরিয়ে নয়, পৃথিবীতে তাকে রেখেই দেখাতে চেয়েছিলাম আমার ক্ষমতা। ক্ষমতার এই খেলাতে সে পুরনো খেলোয়ার এবং ভয়ংকর। আমি নতুন নই, অনেক বিচক্ষণ এবং আরও ভয়ংকর। হয়ে যাবে আজ প্রমাণ, কে কত ভয়ংকর! তার কোনো সুযোগই নেই, সব দিক থেকে জাল বিছানো ছিল। কিন্তু শেষ মূহৃর্তেই জানলাম অন্যকিছু, খুব জঘন্য আর ভয়ংকর কিছু!

 

৩.

খুব পানির তৃষ্ণা পেয়েছে আমার।

গলা শুকিয়ে কাঠ। চোখের পানি আর আসছেনা, সব যেন মরুর গ্রাসে বিলীন। শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। বিধাতাকে আর যে ডাকতে পারছিনা, বিধাতা কি সব দেখেও অন্ধ? মনপ্রাণ দিয়ে যে ডাকলে সবই দেন বিধাতা, একি তাহলে শুধুই ধর্মগ্রন্থের মেকি লাইন? বিধাতা, ও বিধাতা………………

 

৪.

প্রধান সড়ক হতে নেমে বেশ ভেতরে গাড়িগুলো থামলো।

কয়েক মিনিটের হাঁটাপথ শুধু। দূর হতেই দেখা যাচ্ছে দোতলা সেই বাড়িটা। সবাইকে অপেক্ষা করতে বলে আমি, আমার পিএ সমেত আরও দু’জন এগিয়ে চললাম দ্রুততায়। এক একটি মূহুর্ত এখন আমার অনেক মূল্যবান। বাড়ির দরজা খুলতেই সুদৃশ্য ড্রইংরুমে একা বসে থাকতে দেখা গেলো আমার ফুপাতো ভাই হায়াতকে। সে একাই বসে ছিল, অবশ্য তার এসব সময় বাড়ির ভেতর কেউ থাকেনা। যারা বাইরে ছিল তাদের ব্যবস্থা নিঃশব্দে হয়েছে কিছু আগেই। এখন সে মদে চুর পুরোই, তবে হুঁশ আছে ভাল।

 

– ওয়েলকাম ওয়েলকাম আমার ছোট্ট ভাই, আয় কাছে আয়। কতদিন তোরে জড়িয়ে ধরিনা, বলেই কুৎসিত একটা হাসি দিয়ে কাছে এলো হায়াত।

– আমার সময় কম ভাইয়া।

– আরে রাখ, কিসের সময়, কিসের এত তাড়া? আজ রাত হবে তোর আমার মৌজমাস্তির, হে হে হে, দাঁড়া, গ্লাস দেই তোরে।

– না ভাইয়া, তোমার সাথে কথা আছে। তুমি আগে বোস।

– আরে বল, দাঁড়িয়েই বল। আমার আজ বেশ ফুর্তি। দুবাইয়ের রিয়েল এস্টেটের বড় একটা দাও মারলাম। বলেই দু’হাত দু’পাশে পাখার মতো নাচাতে লাগলো হায়াত।

– অভিনন্দন। আমি আজ এসেছি অন্য কারণে ভাইয়া, বলে সামনে আগাতেই বুঝলাম হায়াত কোকেন নিয়েছে একটু আগে। কারণ, টি-টেবিলে সাদা গুঁড়া পড়ে আছে এলোমেলো হয়ে। আর এসবের ব্যবসাও করে থাকে সে অনেক আগে থেকেই।

-অন্য কি কারণ?

– তোমার মেয়ের বয়সী একজনকে ধরে এনেছো তুমি, তোমার নোংরা চাহিদা পূরণের জন্য।

-ওরে আমার খোকারে, উ লে লে লে, তুই এখনও যে খোকাবাবু আছিস, বলেই আমার গাল টানতেই হাত ধরে ফেললাম।

– ভাইয়া, আমি মেয়েটাকে নিতে এসেছি। আর কিছু নয়, তোমার সাথে আমার যে ব্যবসায়ীক দ্বন্দ সেটা তুলে রাখলাম অন্য দিনের জন্য। কিন্তু আজ আমায় কোনো বাঁধা দেবেনা।

– বাঁধা দিলে? যদি দেই? হেই, কি করবি, কি করবি বল? বলে আমার বুকে ধাক্কা মারতে লাগলো।

– ভাইয়া, তুমি এখন নেশাতে আছে। আমরা পড়ে কথা বলবো, আমি যাচ্ছি সেই বাচ্চা মেয়েটাকে নিতে, কোনো বাঁধা দেবেনা। মুখ শক্ত করে ঠান্ডা চোখে বললাম আমি। হেঁটে যাচ্ছিলাম দোতালার সিঁড়ির দিকে যা কিনা ড্রইংরুম হতেই পেঁচিয়ে উপরে উঠে গিয়েছে।

 

কিন্তু এর আগেই হায়াত আমাকে আক্রমন করে বসলো।

আমি নিজেকে সামলেই বা’হাত দিয়ে তার চোয়ালে সজোড়ে মারলাম। সে থমকে গেলো, অবাক চোখে তাকিয়ে রইল আমার দিকে।

-তুই আমার গায়ে হাত তুললি শুয়োরের বাচ্চা, বলেই গা হতে স্যুট খুলে হামলে পড়লো আমার উপর। কবির এবং সাথের দু’জন শুধু চেয়ে দেখছে বিশাল দেহের একই রক্তের দু’জনের লড়াই। কেউ কারও থেকে কম নয়, কেউ কাউকে ছেড়ে দিচ্ছে না। লাথি দিয়ে হায়াতকে মাটিতে ফেলেই আমি নিজের স্যুট খুলে ছুঁড়ে মারলাম, আরও ভয়াবহ হুংকারে ঝাঁপিয়ে পড়লাম নিজেরই রক্তের সম্পর্কিত ভাইয়ের উপর। এখন সে ভাই নয়, সে পশু, মানবরূপী জানোয়ার। কবির বা অন্য কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসবেনা, কারণ এমনই নির্দেশ আছে তাদের। কিন্তু আমি আর থামাতে পারছিনা জানোয়ারটাকে। সে পাগল হয়ে উঠেছে, যেমনটা হয়ে থাকে পাগল কুকুর। সিঁড়ির কাঠের হাতলে মাথা ঠুকে দিলাম তার সজোড়ে। এক পাশ ফেটে রক্ত ঝড়ছে তার, আমার দিকে ক্লান্ত চোখে থাকিয়ে আছে। খেলা এখন আমার হাতে, বুকে সজোড়ে ঘুষি মারতেই সোফার উপর পড়লো। আর সাথে সাথে তার নজর গেলো সোফার এক কোণে পড়ে থাকা পিস্তলের দিকে। মানুষের চরিত্র কতই না অদ্ভুত! যখন ছোট ছিলাম, তখন আমার এই ভাইটা কতই না ঘুরিয়েছে কাঁধে নিয়ে। যা চাইতাম তাই দিতো, কোনো কিছুর জন্য তার নিকট কত আবদার করতাম। সব যেন চোখে ভেসে আসছে। আর আজ আমরা একে অন্যকে শেষ করে দেবার নেশায় মেতে উঠেছি। আমি একটি বাচ্চা মেয়েকে বাঁচাতে এসেছি সব ছেড়ে, আর আমার ভাই সেই বাচ্চা মেয়েকে ভোগ করতে চাইছে প্রয়োজনে নিজের রক্তের সম্পর্কিত ভাইকে মেরে।

 

আস্তে আস্তে তার পিস্তল উঠানো হাত দেখলাম।

বাড়ি কাঁপিয়ে দু’টো শব্দ হলো।

হায়াত বিস্ময়কর চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, আমার বাম হাতে ধরা রিভলবারের দিকে। সাদা স্ট্রাইপ শার্টের বাম পাশ হতে রক্ত রঙিন করে তুলছে শার্টের চারপাশ। মুখ দিয়ে শুধু একটিই শব্দ উচ্চারণ হলো,”মিজহাব”। হ্যাঁ, আমার নামটিই ছিল তার বলা শেষ শব্দ!

 

৫.

দরজা খুলবার শব্দ পেলাম।

এতক্ষণ চোখ বুজে ছিলাম। জ্ঞান হারিয়েছিলাম কি?

আস্তে করে ভেতরে যিনি এলেন, তাকে কেমন যেন দেখেছি বলে মনে হলো। হ্যাঁ, যে পশুটা তাকে ভোগ করবে তার সাথে এই লোকটার চেহারা অনেক মিল। কিন্তু চোখ দু’টো ভীষন রকমের ঠান্ডা, কেমন যেন তাকিয়ে থাকা যায়না বেশিক্ষণ। এসেই আমার মুখ হতে কাপড়টা খুললেন, হাত-পায়ের বাঁধন খুললেন। আমি আমার অঙ্গ-প্রতঙ্গের কিছু যে টের পাচ্ছি না। শুধু চোখ দিয়ে দেখছি নির্বিকারভাবে। আচ্ছা, এই লোকটা কি আমাকে ভোগ করবে? কিছু বলবার আগেই আমাকে সে দু’হাত দিয়ে তুলে নিলো। হঠাৎ আমার মনে হলো এই লোকটা আমার খারাপ কিচ্ছু করবেনা। খুব দ্রুততরা সাথে আমাকে কোলে নিয়ে নামছে লোকটি। আমি দু’হাত দিয়ে তার গলা জড়িয়ে রইলাম। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই দেখি সেই পশুটা আকাশের দিকে তাকিয়ে মাটিতে পড়ে আছে। আমি কি পাথর হয়ে গেলাম? আমার ভেতর কেন যেন ভয় বা অন্য কোনো অনুভূতি কাজ করছেনা। ভেতর ভেতর মনটা কেমন যেন হেসে উঠলো, বিজয়ীর এক প্রশান্তি নেমে আসলো বুকে। একজন পাশ হতে এসে একটি স্যুট দিয়ে আমাকে ঢেকে দিলো যার করো আছি তার নির্দেশে। এরপর সবাই দ্রুত হেঁটে চলেছে। বাইরে আজ জোছনা, চাঁদকে আজ অনেক বড় লাগছে। আমার চোখ বুজে আসতে চাইছে, কিন্তু আমি আমার বাহককে দেখে যাচ্ছি। কে এই লোকটি? আমি খুব ক্লান্ত বোধ করছি, খুব, খুব………….

 

৬.

মেয়েটি আমার গলা শক্ত করে ধরে আছে।

আমি তাকে দ্রুত গাড়িতে উঠিয়ে শুইয়ে দিলাম। মাথাটা রাখলাম আমার কোলের উপর। তার একটি হাত আমার হাত আঁকড়ে আছে।

– কবির, কুইক, সেকেন্ড হোমে চলো। আর জলদি ডাক্তার, নার্সকে হাজির হতে বলো।

গাড়ি ছুটে চলেছে আবারও দ্রুত, যত দ্রুত এসেছিলাম এর থেকেও দ্রুত……………………..

 

৭.

ঘুম ভাঙতেই দেখি কাল রাতের সেই লোকটা বিছানার পাশে সোফায় বসে আছে। সামনে চায়ের সরঞ্জাম সাজানো। তার পড়নে এখনও কাল রাতের পোশাক, সারারাত ঘুমায়নি বোঝা যাচ্ছে। এখন তার চেহারা দিনের আলোতে ভাল ভাবে দেখলাম। মুখে একটু স্মিত হাসি এনে আমার মাথার কাছে এসে বললো,

– বোন, কেমন লাগছে তোমার এখন?

আমি মনে হয় নিজের ভেতর নেই, কি করছি জানিনা ঠিক। আমি উঠেই জড়িয়ে ধরলাম তাকে, জড়িয়েই রইলাম তার বিশাল বুকে। চোখের পানি বাঁধ ভেঙ্গে উপছে পড়ছে শুধু। আমার মাথার ভেতর হালকা আজ, অনেক হালকা, অনেক প্রশান্তি। পৃথিবীর সবথেকে নিরাপদ আশ্রয় মনে হয় এই আমাকে বোন বলে ডাক দেয়া লোকটার বুক। আমার আর কোনো ভয় নেই, কোনো কিছুই আমাকে স্পর্শ করতে পারবেনা মনে হয়। আমি জড়িয়েই আছি, কেঁদেই যে আছি। পরম মমতা মাখানো একটি হাত মাথায় হাত বুলিয়ে যে আমাকে আরও প্রশান্তিতে বিছিয়ে দিচ্ছে।

 

৮.

ঠিক এক মাস পর।

আভাকে নিয়ে এলাম শহরের অদূরে অবস্থিত আমার একটি প্রজেক্টে। প্রধান সড়কের পাশেই এখানে রয়েছে বিশাল একটি জায়গা। এর বাজার মূল্য অকল্পনীয় রকমের।

এখানে একটি নতুন ফ্যাক্টরী উঠবে, তাই সাথে বেশ কিছু প্রকৌশলীও এসেছেন। অনেক সুন্দর একটি জায়গা, চারপাশে দেয়াল দিয়ে ঘেরা। এর মাঝে হরেক রকমের গাছ-গাছালী, আর একেবারে পেছনে বেশ বড় একটি পুকুর। আভা ছুটে বেড়াচ্ছে এখান থেকে সেখানে। আর আমি এখানে ভবিষ্যতে তৈরি ফ্যাক্টরীর প্ল্যান দেখছি। কিন্তু কাগজ হতে চোখ বারবার চলে যাচ্ছে মেয়েটির দিকে। সে পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে।

– তোমার এই জায়গাটা পছন্দ হয়েছে আপু?

– হ্যাঁ, কি সুন্দর জায়গা! মনে হচ্ছে কত আপন এই জায়গাটি! এমন জায়গাতে কেউ ফ্যাক্টরী করে ভাইয়া?

– কে বলেছে ফ্যাক্টরী হবে?

– তুমি না বললে আসবার সময়?

– ওহ, এখনও ঠিক হয়নি তো আপু। দেখি কি করা যায়। কয়েক মূহুর্তেই নেয়া নিজের চিন্তাকে প্রশ্রয় দিলাম একটি মিথ্যা কথার উত্তর দিয়ে।

-এখানে হবে একটি সুন্দর বাড়ি, যার বারান্দা দিয়ে পুকুর দেখা যাবে একদম কাছে থেকে। আর সামনে গাছ তো আছেই। ভাল হবে না ভাইয়া?

– হ্যাঁ, অনেক সুন্দর হবে। বলেই আভার চোখে মুগ্ধতার পরশ দেখে গেলাম নির্বাক হয়ে।

 

৯.

আমি এখন সব সময় ডায়রী লিখি।

মাঝে মাঝে মা’কে পড়তে দেই, আবার আব্বুকেও। আর এই লেখাগুলো রাখছি আমার ভাইটার জন্য। হ্যাঁ, আমার তো একটাই ভাই। সবাই চেনে মিজহাব বলে। কিন্তু আমার কাছে শুধুই আমার ভাইয়া। এখন আমার জীবনটা অনেক সুন্দর, ঠিক আগের মতই। আমার ভাইটা কিছুটা পাগল ধরনের। কখনও খুব নরম আবার কখনও ভয়ানক কঠোর। আর পাগল না হলে কেউ এত দামী সেই প্রজেক্টের জমি কি আমার নামে লিখে দেয়? আবার সাথে এটাও আছে যে , আমার তৈরি করা নকশাতে যেন সেখানে একটি দোতলা বাড়ি উঠে। আমি যেন দোতলাম বারান্দায় দাঁড়িয়ে পুকুর দেখতে পারি, প্রকৃতির রূপ দেখতে পারি। আমি মাঝে মাঝে আমার স্বপ্নের সেই বাড়িটির ছবি আঁকি। ঠিক এমনই একটি বাড়ি উঠবে সেখানে, যেখানে আমি থাকবো, ভাবতেই কেমন লাগছে। আমাকে বিদায় দেবার সময় ভাইয়াটা বলেছিলো যে, আর কখনও আমার সাথে তার দেখা হবেনা। আমি কোনো কথা বলিনি, শুধু তাঁকে জড়িয়ে ধরে চলে এসেছিলাম। তাঁর চোখের দিকে তাকাইনি, সেখানে কঠোরতা হয়তো দেখতে পেতাম। আমার কাছে যে সে শুধুই আমার ভাইয়া………….

 

মাঝে মাঝে চিন্তা করি, আমার নকশা করা বাড়িতে কোনো এক সময় আমার ভাইয়া আসবেন। এসে আমাকে আদর করবেন, তাঁর বিশাল বুকে আমি ঝাঁপিয়ে পড়ে কাঁদবো, হাসবো, ভালবাসবো, ভাইয়া ভাইয়া ডেকে যাবো।

পৃথিবীটা সত্যিই অনেক সুন্দর!

 

 

 

 

 

মঞ্জীর

গল্প বা কবিতা লিখতাম যখন, তখন তুমি আমাকে বিরক্ত করতে খুব ভালবাসতে।
লেখার গভীরে এমনভাবে ডুবে যেতাম যে পৃথিবীর কোনো কিছুর প্রতিই খেয়াল থাকতো না আমার। চোখ থাকতো কাগজে বা ল্যাপটপের স্ক্রীণে, মন ঘুরে বেড়াতো অজানা কোনো অলি-গলিতে। লেখা খুঁজে বেড়াতাম অজানা সেখানে, মাঝে মাঝে পেতাম, মাঝে মাঝে নিজেই হারিয়ে যেতাম। অচেতন মনকে তুমি নিয়ে আসতে জগতে তোমার দুষ্ট হাসির ঝংকারে। উড়তে থাকা অবচেতন মন আমার মাটিতে এসে যেত তোমার হাতের স্পর্শে। তখন কিছুটা আমি হতভম্ব হয়ে যেতাম, চুপ করে যেতাম। আমার সেই রূপ দেখে তোমার হাসি আরও বেড়ে যেত অথবা তোমার চোখের তারাগুলো জ্বলতে থাকতো দুষ্টমিতে। আমি আরও গম্ভীর হয়ে যেতাম। লেখার ভাবটা নষ্ট হয়ে যেত, কাগজ-কলম বা ল্যাপটপ হতে উঠে যেতাম চুপটি করে। তখন হয়তো বা মাঝে মধ্যে চা কিংবা কফির মগ এগিয়ে দিতে। কখনও হাত বাড়িয়ে নিতাম, কখনও ফিরিয়ে দিতাম।

বর্ষাতে পথ সিক্ত হয়ে যেত, অপলক চোখে তা দেখতাম।
লেখা খুঁজে যেতাম আমি সেই ভেজা পথের দিকে তাকিয়ে, অথবা বৃষ্টির শব্দের সাথে তাল মেলাতে চেষ্টা করতাম মনের স্পন্দনের। বাতাসের তীব্র শব্দে, সন্ধ্যায় ঝড়ের প্রলয়ের মাঝে কখনও আমি কবিতা খুঁজে পেতাম। কিন্তু লেখা হতো না সেই কবিতা। হারিয়ে যেত, শুধু ক’টা লাইনই মনে থাকতো। কবিতা হারানোর জন্য শুধু তুমিই দায়ী ছিলে, আমার কবিতাকে সেই বাতাসের সাথে উড়িয়ে দিতে তুমি নিজের অজান্তে। তোমার নূপুরের শব্দ আমার ধ্যান ভেঙ্গে দিতো। হয়তো বা ইচ্ছে করেই, যখন সেই সন্ধ্যাতেই আমাকে টেনে নিয়ে যেতে ছাদে বৃষ্টিতে ভিজবার জন্য।  আমি নীরবে দাঁড়িয়ে শুধু সেই বৃষ্টির ভেতর তোমার রূপ দেখতাম। তোমার কি অনেক রূপ ছিল? বহুরূপী? নয়তো কেন সেই বৃষ্টির মাঝে তোমার অন্য রূপ ধরা পড়তো? টানা চোখগুলো যেন আরও টেনে যেত বৃষ্টি, স্নিগ্ধতা আরও বৃদ্ধি পেত বৃষ্টির পানিতে। আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরে বৃষ্টি মিশ্রিত সেই স্নিগ্ধতার ঘ্রাণ নিতাম। চোখ বুঁজে আবারও হারিয়ে যেতাম আমার লেখায়। কবিতা নয়, আমি হেঁটে বেড়াতাম গল্পের মাঝে। পুরো নতুন এক গল্প, যা আমি খুঁজে পেলাম তোমার স্নিগ্ধতায় এই মূহুর্তেই। কিন্তু আবারও সেই গল্পের ছন্দপতন, তুমি বৃষ্টির ঠান্ডা পানিতে কাঁপছো আমাকে জড়িয়ে ধরে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেই কত-শত বৃষ্টির ফোঁটার মাঝেও আমি তোমার অশ্রু চিনে নিতে পারতাম। খুঁজে পেতাম সেই গড়িয়ে পড়া জল, আবারও কোনো এক কবিতা এসে যেত মনের গহীনে। আমি হারাতাম, তুমি আমায় ঠিকই খুঁজে নিতে।

একদিন, দু’জন গিয়েছিলাম শহর হতে দূরে, অনেক দূরে।
শীতের পরশ আর সর্ষে ফুলের ঘ্রাণে আমি লেখা বা কবিতায় নয়, প্রকৃতির পংক্তিতে হারিয়ে যেতাম। তোমায় নিয়েই হারাতাম। চোখের পাতা তখন বোধহয় ভুলে গিয়েছিল পলক ফেলবার। প্রকৃতির সেই রূপে আমি খুব যে চেনা ছিলাম, তবু আমি শুধুই মুগ্ধ ছিলাম। প্রকৃতির পংক্তিমালায় নিজের সংকীর্ণতা খুঁজে পেলাম, নিজের শত শত লেখা তখন মাটিতে মিশিয়ে দিতে মন চাইছিলো। ঠিক তখনই আবার তোমাকে দেখলাম সর্ষের হলুদের মাঝে, সবুজ শাড়িতে। প্রকৃতির আরেক রূপ যেন প্রকাশ পেলো তোমার উচ্ছলতায়, তোমার চপলতায়। তুমিই সেই প্রকৃতি ছিলে, তোমার হাসিতেই সেই সর্ষে ফুলের ঘ্রাণ আরও তীব্র হচ্ছিল, আমায় কাছে টেনে নিয়েছিলো। আমি নিজেও হয়েছিলাম সেই প্রকৃতির অংশ। নিজেকে আবারও খুঁজে পেলাম অন্যরকম এক গল্পের মাঝে। সেই গল্পের শুরু কোথায় বা শেষ কোথায় আমার জানা ছিলো না। শুধু জানতাম, আমি সেই গল্পের একটি চরিত্র। কিংবা অতিথি চরিত্র।

ভুল ছিল, অনেক ভুল ছিল।
আমি অতিথি চরিত্র হতে পারিনা। আমি কেন্দ্রিয় চরিত্রের একজন, যে কিনা বিন্যাস করে গল্প বা কবিতা। কিন্তু তুমি সেই প্রকৃতিতে হটিয়ে দিয়েছিলে আমায়। তাই হয়ে গেলাম আমি শুধুই অতিথি চরিত্রের এক গল্প। সেই চরিত্রের হয়েও আমি সাহস করেছিলাম কেন্দ্রিয় চরিত্রের তোমাকে রাঙিয়ে দেবার, তোমার পংক্তিমালায় আরও কিছু লেখা যোগ করবার। সৃষ্টিকর্তা যে গুণ আমায় দিয়েছেন, তা ম্লান হচ্ছে তোমার প্রকৃতির কাছে, তোমার এই তীব্র ভালবাসার কাছে।

সেই সময়ের কথা কি মনে আছে?
যখন আমাদের প্রথম দেখা, যখন প্রথম দু’চোখের সাথে কথা বলা।
আমার প্রতিটি মূহুর্ত মনে আছে। আমিই তো ছিলাম সেই প্রেমের রচয়িতা, তুমি ছিলে আমার সেই পংক্তিমালা। বিকেলের বাতাসে উড়তে থাকা তোমার সেই চুল যেন ছিল আমার গল্পের কোনো এক লাইনের কালো মেঘ অথবা কালো হয়ে আসা ঝড়ের প্রথম সময়। এরপর তোমার সেই অপলক তাকিয়ে থাকা, নীরবে দু’জনের ভালবাসার প্রকাশ, দু’জনের জীবন এক সূঁতোয় বাঁধা। তারপর? তারপর শুধু আমার নিজের গল্পে প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাওয়া।

যখন আমার গল্প বা কবিতার জগৎ হতে আমাকে টেনে আনতে, অনেক রাগ করতাম আমি।
কখনও বা খুব কাঁদিয়েছি আমি তোমাকে তীব্র ভাষার ব্যবহারে। বিকেলের সোনালী রোদে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে তুমি শুধুই নীরবে। তুমি কি জানতে, সে দৃশ্য ছিল আমার দেখা পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর দৃশ্য! আমি মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকতাম তোমার দিকে। তোমার মুখ কিছুটা রাঙানো থাকতো বিকেলের রোদে, আর কিছুটা অভিমানে। আমি আবারও হার মানতাম প্রকৃতির এই অপরূপ দৃশ্য দেখে। এখনও চোখে ভাসে, চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই আমি।
আমি সেই গল্পের এখনও দিকে তাকিয়ে থাকি বিরতিহীন, ক্লান্তিহীন। মনের কলম লিখে চলে তোমার সেই দৃশ্য, রং-তুলি এঁকে চলে তোমার সেই পংক্তি।

এখনও যখন লিখতে বসি, আমি আর পাই না তোমায়।
তুমি আর বাঁধা দাওনা আমাকে, তোমার সেই দুষ্টমী ভরা হাসি আজ হারিয়ে গিয়েছে দূর হতে অনেক দূরে।
তবু লিখবার আগে চেয়ে দেখি দেয়ালে টানানো তোমার এক মূহুর্তের ছবির দিকে। হাসিটা অমলিন এখনও, সময় গিয়েছে থমকে তোমার। কিন্তু আমি এখনও সেই গল্প বা কবিতার মাঝে হারিয়ে চলি। কারণ, তোমাকে যে খুঁজে পাই শুধু সেখানেই। তুমি তো আমার অলিখিত সব গল্পের লাইন, তোমার প্রতিটি মূহুর্তই আমার না লেখা সব কবিতা।

আমি লিখে চলি, আঁধার রাত কিংবা স্নিগ্ধ ভোরবেলায়।
যদি পারো, এসে আমাকে খুঁজে নিও।
আর না হয় এসে আমাকে সব ভুলিয়ে দিয়ে যেও তোমার সেই নূপুরের শব্দ।

[ গল্প ]
গল্পের ছায়ায় ছোটগল্প:

রিয়েল ডেমোন

পরিচয় করিয়ে দেবার কিছু কি আছে?
নিত্য নতুন, বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষামূলক গল্প লিখবার জুড়ি নেই। ভার্চুয়াল পাঠকশ্রেণীর মাঝে রিয়েল যে কতটুকু জনপ্রিয় সেটা ব্লগে বা ফেসবুকের পেজে রিয়েলের গল্প প্রকাশ করবার সাথে সাথেই বোঝা যায়। রিয়েলের প্রচন্ড একটি ক্ষমতা হচ্ছে গল্পের শুরু হতে শেষ পর্যন্ত পাঠককে ধরে রাখতে পারা। প্রচণ্ড শক্তিশালী যার লেখনি, সে যে আমার ভাই এটা আমি পরিচয় দিতে মনে হয় একটু বেশি মাত্রায় গর্ববোধ করি। কিছু মানুষ আছে বলবার জন্য অন্যকে আপন করতে পারে। কিছু আছে হৃদয় দিয়ে শুধু আপন নয়, আঁকড়েও ধরতে পারে। এই ছেলেটি এমনই একজন যে, ভালবাসা না দিয়ে থাকা যায় না। রিয়েলের হাস্যরস, মন্তব্য, বিভিন্ন মজার কিছু শেয়ার যেন ফেসবুককে জীবিত রেখেছে। প্রতিনিয়ত সকলের মন ভাল রাখবার এক অন্যরকম খেয়াল যেন ছেলেটি নিয়ে বসে আছে। কারও হয়তো মন খারাপ অথবা সমস্যা, সাথে সাথে রিয়েলের ঝাঁপিয়ে পড়া। যতক্ষণ না মন ভাল হচ্ছে ততক্ষণ তার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেই। ব্যক্তি জীবনে প্রচন্ড পরিশ্রমী এই ছেলেটি শত ব্যস্ততার মাঝেও লিখে চলছে অবিরাম। লেখাই রিয়েলের সত্যিকার প্রশান্তি, যার দরুন প্রবাসের নিঃসঙ্গ জীবনে সে একটুকু বিরতিতেও লিখে যায় নিজের জন্য, আমাদের জন্য।

আমার এই ভাইটা খুব অমায়িক একজন।
রিয়েলের মাধ্যমে পরিচিত যারা, তাঁরাও অনেক প্রচন্ড রকমের অমায়িক এবং বন্ধুবৎসল। রিয়েলের মাধ্যমেই পেয়েছি আমি বেশ কিছু চমৎকার ছোট ভাই এবং বোন, যাদের কথা একদিন লিখবো আমি। লেখক রিয়েলকে আমি দেখি একভাবে, ব্যক্তি রিয়েলকে আরেকভাবে। লেখক রিয়েলের লেখা যখন পড়ি, তখন চেষ্টা করি অনেক কিছু শিখবার। ওর লেখার কেমন ভক্ত আমি সেটি বলে বোঝানো যাবেনা। ব্লগে আমাকে নিয়ে রিয়েলের একটি কবিতা আছে। আমি প্রথমে সেটি পড়ে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কি বলভো, এতটাই অবাক হয়েছিলাম। কিছু না জেনেও সে কিভাবে আমার জীবনের কিছু পংক্তি রচনা করে ফেলেছিলো তার সে কবিতাতে, সেটি এখনও ভাবি মাঝে মাঝে। আর অন্যান্য লেখা নিয়ে বলবার কিছু নেই। রিয়েলের চমৎকার সব গল্পের মাঝে একটি গল্প হচ্ছে “কর্দমাক্ত ঘামের কাহিনী”। কি কারণে ঠিক বলতে পারবো না, রিয়েলের এই গল্পটি আমার এত প্রিয় যে মাঝে মাঝে গুগল রিডারে ঢুকে গল্পটি পড়ি আমি। আর “কফিশপ”-এর তুলনা শুধুই “কফিশপ”।

আজ রিয়েলের জন্মদিন।
উপরের গল্পটি রিয়েলের জন্মদিনের জন্য উপহার নয়। গল্পটি রিয়েলের জন্মদিন উপলক্ষে লেখা। রিয়েলের জন্মদিনের জন্য উপহার রইল খুব সাধারণ এই আমার ভালবাসা, সবসময়ের জন্য।
এই জন্মদিনই নয় শুধু, জীবনের বাকি সব জন্মদিনগুলোতে এভাবে একসাথে যেন আমরা আনন্দ করতে পারি এই কামনাই রইল। কি হাসি বা কি কান্না, সবসময় সাথে থাকা হোক।

শুভ জন্মদিন আমার ছোট্ট ভাইটা।
শুধুই ভালবাসা তোমার জন্য।


দু’নয়নের প্রতীক্ষা

বারে বারে তোমায় নিয়ে লিখতে যেয়ে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি।

আবারও বসে পড়ি লিখতে শুধু তোমায় নিয়ে।

অতীতকে ছুঁড়ে দিলাম যখন, তখনই কেন বিদায় নিলে?

বিদায় নিতেই যদি এসেছিলে তবে কেন জীবনে জড়ালে?

 

আজ কি তুমি এখনও আকঁছো ছবি কোনো এক পাথরে বসে?

অথবা লিখছো কি চিঠি?

আমি আজও তোমার চিঠির অপেক্ষাতেই থাকি সেটা কি জানো?

মেঘলা হাওয়ায় উড়িয়ে নেয়, রক্তাক্ত হৃদয় নিংড়ে পড়ে,

তবু আমি ছুটে যাই প্রথম পাওয়া সেই চিঠির এলোমেলো পাতার দিকে।

 

তবু সুখে থেকো, সাগর নীল দু’চোখের অশ্রুতে রাঙিও না মন।

সব অশ্রুর রং এঁকে যাক আমার মনের ক্ষত-বিক্ষত পংক্তিতে।

বরফের শুভ্রতায় তোমার পায়ের ছাপ কি পড়ে এখনও?

ছোট ছোট পাহাড়ের বাঁকে হারাও কি তুমি কখনও?

মনে আছে কি সেই প্রথম সন্ধ্যা?

চোখে ভাসে কি সেই প্রথম দেখা? প্রথম অনুভব?

আবারও প্রশ্ন করি তোমাকে?

কে তুমি?

কেন এসেছিলে এই দগ্ধ, অন্ধকার জীবনে?

 

সবুজের মাঝে আমি আর কাউকে যে পাই না।

প্রজাপতি যে বসে না তোমার সেই হাতে।

আমি আজও রাত জেগে থাকি, অপেক্ষায়।

যদি বা এসে আমায় না পাও, তারই অপেক্ষায়।

 

আমি আছি, এখানেই বসে আছি।

তোমার অপেক্ষাতেই আছি।

রাজকুমারী, তুমি জেগে উঠলে আমাকেই পাবে যে পাশে।

তাই আমি আছি।

দূরে কোথাও এক জীবন সন্ধিক্ষণেই আছি।